সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

যদি সবকিছুই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় হয় ও সব বিপদই তাঁর অনুমতিতে ঘটে, তবে মানুষের অপরাধের দায় কার?

মানুষ হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের মনেই জীবন, জগৎ এবং এর পেছনের চালিকাশক্তি নিয়ে নানা প্রশ্ন জাগে। বিশেষ করে যখন আমরা চারপাশে নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখি কিংবা কোনো মানুষের করা চরম অন্যায় দেখি, তখন মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—"যদি একজন সর্বশক্তিমান ঈশ্বর থাকেন, তবে পৃথিবীতে এত কষ্ট কেন? সবকিছু যদি তাঁর ইচ্ছায় চলে, তবে মানুষের অপরাধের জন্য মানুষকে কেন দায়ী করা হবে?"

আসুন, আজ আমরা কোনো অন্ধ আবেগ বা ব্যক্তিগত আক্রমণ ছাড়া, সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক, বৈজ্ঞানিক এবং ইসলামিক দর্শনের অকাট্য দলিলের আলোকে এই প্রশ্নগুলোর গভীরে প্রবেশ করি।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ: স্রষ্টার জুলুম নাকি মহাবিশ্ব টিকিয়ে রাখার অপরিহার্য মেকানিজম?

কুরআনের সূরা আত-তাগাবুনের ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: "আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদই আপতিত হয় না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে, তিনি তার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন।"

আমরা যেগুলোকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলি (যেমন ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড়), আধুনিক বিজ্ঞান কিন্তু এই দুর্যোগগুলোর পেছনের এক পরম সত্য উন্মোচন করেছে। বিজ্ঞান বলছে, এগুলো আসলে কোনো ত্রুটি বা জুলুম নয়, বরং পৃথিবী নামক গ্রহটিকে সচল ও মানুষের বাসের যোগ্য রাখার অপরিহার্য বৈজ্ঞানিক মেকানিজম:

টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া (ভূমিকম্প): এটি না হলে পৃথিবীর ভেতরের প্রচণ্ড তাপ ও গ্যাস বাইরে বের হতে পারত না। ফলে পুরো গ্রহটি একটি জীবন্ত টাইম-বোমা হয়ে যেত এবং একসময় বিশাল বিস্ফোরণে পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত।

ঘূর্ণিঝড় ও বায়ুপ্রবাহ: ঘূর্ণিঝড় না হলে বিষুবরেখার প্রচণ্ড গরমে পৃথিবীর অর্ধেক অংশ পুড়ে ছাই হয়ে যেত, আর বাকি অর্ধেক মেরু অঞ্চলের তীব্র ঠাণ্ডায় বরফ হয়ে জমে যেত।

আমরা যেটাকে সাময়িক 'দুর্যোগ' হিসেবে দেখে কষ্ট পাচ্ছি, তা আসলে পুরো মানবজাতিকে পৃথিবীতে টিকিয়ে রাখার জন্য স্রষ্টার এক সুপ্ত প্রাকৃতিক নিয়ম ও বৈজ্ঞানিক মেকানিজম।

অলৌকিকতা বনাম বাস্তব পৃথিবী

একটি বাস্তব জগৎ সচল থাকার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মের প্রয়োজন। মাধ্যাকর্ষণ বা ফিজিক্সের সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে বলেই পৃথিবী একটি বাস্তব জগৎ। আল্লাহ যদি প্রতিবার ঝড় বা ভূমিকম্পের সময় অলৌকিকভাবে ফিজিক্সের নিয়ম বন্ধ করে দিতেন, তবে প্রকৃতির কোনো ‘নির্দিষ্ট নিয়ম’ থাকত না।

প্রকৃতির নিয়ম যদি প্রতি সেকেন্ডে অলৌকিকভাবে পরিবর্তিত হতো, তবে মানুষ কখনো বিজ্ঞানচর্চা করতে পারত না। কারণ ল্যাবরেটরিতে প্রতিবার একই পরীক্ষা করলে একেক রকম ফলাফল আসত। বিজ্ঞান নামের বিষয়ের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে যেত। ঈশ্বর পৃথিবীকে কোনো কল্পরাজ্য বা রূপকথার দেশ হিসেবে বানাননি, একে বানিয়েছেন নির্দিষ্ট নিয়মে চলা এক বাস্তব জগৎ হিসেবে।

পৃথিবী কোনো 'জান্নাত' বা পরম সুখের জায়গা নয়

আমাদের চিন্তার মূল ভুলটা হয় তখন, যখন আমরা এই পৃথিবীকে 'পরম সুখের জায়গা' বা আমাদের শেষ গন্তব্য মনে করি। ইসলাম শুরুতেই এই ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছে। ইসলাম বলে—এই পৃথিবী কোনো আরামের জায়গা নয়, এটি একটি সাময়িক 'পরীক্ষাগার'।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ স্পষ্ট করে বলেছেন: "এবং আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতিের মাধ্যমে; আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৫৫)

পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রশ্ন কঠিন হবে, পরিস্থিতি প্রতিকূল হবে—এটাই স্বাভাবিক। কোনো কষ্ট, রোগ বা দুর্যোগ ছাড়া নিখুঁত যে আরামের জায়গার কথা মানুষ কল্পনা করে, সেটির নাম 'জান্নাত', যা মানুষের চিরস্থায়ী গন্তব্য এবং যা মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য নির্ধারিত।

স্রষ্টার পরম দয়া ও ক্ষণস্থায়ী কষ্টের স্থায়ী প্রতিদান

দুর্যোগে অসহায় বা দরিদ্র মানুষের মৃত্যু কোনো জুলুমের শেষ নয়, বরং এক অনন্ত সুখের সূচনা। নাস্তিক্যবাদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, তারা জীবনকে কেবল এই দুনিয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ মনে করে। কিন্তু ইসলামের সমীকরণটি অনেক বড়।

ইসলাম অনুযায়ী, কোনো গরিব বা সাধারণ মানুষ যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা যান, তবে তিনি 'শহীদের' মর্যাদা পান। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন: "শহীদ পাঁচ প্রকার... (যার মধ্যে রয়েছে) চূর্ণ-বিচূর্ণ বা দেয়াল চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তি এবং পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২৮২৯)

ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার কয়েক মিনিটের কষ্টের বিনিময়ে যদি কেউ অনন্তকালের পরম সুখের জান্নাত পেয়ে যায় এবং সরাসরি সেখানে প্রবেশ করে, তবে পরম ঈশ্বরের সমীকরণে তা জুলুম নয়, বরং এক মহাসুযোগ ও পরম দয়া। দুনিয়ার কষ্টটা সেখানে গিয়ে একটি স্বপ্নের মতো মনে হবে।

"আল্লাহর ইচ্ছা" বনাম "মানুষের স্বাধীনতা": ভুল ধারণার অবসান

পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইনসান (৩০) এবং সূরা আত-তাকভীর (২৯) আয়াতে বলা হয়েছে: "তোমরা ইচ্ছা করতে পারো না, যদি না বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা করেন।"

মূল কথা: এখানে আল্লাহ মূলত বুঝিয়েছেন, 'আমি (আল্লাহ) তোমার (মানুষের) শরীরের পুরো ভেতরের ব্যবস্থা (হৃৎপিণ্ড, রক্ত চলাচল, ইত্যাদি) সচল রাখার ইচ্ছা করেছি বলেই, তুমি আমার দেওয়া স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে নিজের মতো করে কাজ করার ইচ্ছা বা সিদ্ধান্ত নিতে পারছ।' আল্লাহ যদি ইচ্ছা না করতেন, তবে মানুষের হৃৎপিণ্ড, রক্ত চলাচল বা অভিকর্ষ বল কিছুই কাজ করত না, আর মানুষও তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করার সুযোগ বা ইচ্ছাটুকুই করতে পারত না।

এই আয়াতগুলো দেখে অনেকে মনে করেন, মানুষের তো কোনো স্বাধীনতা নেই, তবে মানুষের পাপের জন্য তাকে কেন সাজা দেওয়া হবে? এটি একটি মারাত্মক ভুল ধারণা। এখানে 'আল্লাহর ইচ্ছা' বলতে আপনাকে জোর করে কোনো কাজ করানো বোঝানো হয়নি। এর গভীর অর্থটি বুঝলে যেকোনো যুক্তিবাদী মানুষ স্তব্ধ হয়ে যাবেন:

ধরুন, আপনি হাত তোলার ইচ্ছা করলেন। আপনার মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, রক্ত চলাচল এবং প্রকৃতির নিয়ম ঠিকঠাক কাজ করলেই কেবল হাতটি উঠবে। এখানে আল্লাহ মূলত বুঝিয়েছেন, "আমি (আল্লাহ) তোমার (মানুষের) শরীরের পুরো ভেতরের ব্যবস্থা (হৃৎপিণ্ড, রক্ত চলাচল, ইত্যাদি) সচল রাখার ইচ্ছা করেছি বলেই, তুমি আমার দেওয়া স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে নিজের মতো করে কাজ করার ইচ্ছা বা সিদ্ধান্ত নিতে পারছ।"

আল্লাহ যদি ইচ্ছা না করতেন, তবে মানুষের হৃৎপিণ্ড, রক্ত চলাচল বা অভিকর্ষ বল কিছুই কাজ করত না, আর মানুষও তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করার সুযোগ বা ইচ্ছাটুকুই করতে পারত না। আল্লাহ শক্তি দিয়েছেন, কিন্তু ভালো-মন্দ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা কেড়ে নেননি।

আল্লাহ মানুষকে যে স্বাধীন চিন্তাশক্তি দিয়েছেন, তা অত্যন্ত শক্তিশালী। শয়তান বা জিন চাইলেও আপনার স্বাধীন সিদ্ধান্তে জোর খাটাতে পারবে না, বড়জোর কুপ্রস্তাব (ওয়াসওয়াসা) দিতে পারবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার আল্লাহ শুধুই মানুষকে দিয়েছেন।

"আল্লাহর ইচ্ছা" এবং "আল্লাহর সন্তুষ্টি" এক জিনিস নয়

মহাবিশ্বে আল্লাহর অনুমতি বা ইচ্ছা ছাড়া একটা পাতাও নড়ে না—এটি সত্য। আপনি যদি একটি খারাপ কাজ (যেমন চুরি করা) করতে চান, তবে আপনার হাত নাড়ানোর জন্য যে শারীরিক শক্তি বা বায়োলজিক্যাল মেকানিজম দরকার, তা আল্লাহর দেওয়া নিয়মেই কাজ করবে। আল্লাহ চাইলে আপনার হাত তখনই অবশ করে দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি আপনাকে পরীক্ষার জন্য স্বাধীনতা দিয়েছেন।

এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য: চুরি বা অপরাধ করার সময় আল্লাহ আপনাকে শক্তি দিয়ে সেই কাজটি করার অনুমতি দিচ্ছেন আপনার পরীক্ষার স্বার্থে, কিন্তু তিনি আপনার এই কাজে মোটেও সন্তুষ্ট নন। ইসলামে "আল্লাহর ইচ্ছা" আর "আল্লাহর সন্তুষ্টি" এক জিনিস নয়

ঠিক এর পরের আয়াতেই (সূরা আল-ইনসান: ৩১) আল্লাহ বলেছেন, তিনি জালিমদের (অপরাধীদের) শাস্তি দেবেন। কাউকে জোর করে পাপ করালে তাকে কখনোই 'জালিম' বলা যায় না। অপরাধী তখনই বলা হয়, যখন মানুষের স্বাধীনতা থাকে এবং সে নিজের ইচ্ছায় অপরাধ করে। আল্লাহ কাউকে জোর করে পাপ করান না, বরং মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার চূড়ান্ত পরিণতি প্রকাশের সুযোগ দেন মাত্র।

প্রশ্ন 1: শয়তান যদি মানুষকে ধোঁকা দেয় এবং পাপের দিকে প্ররোচিত করে, তবে মানুষের শাস্তি কেন হবে? অপরাধ তো শয়তানের!

উত্তর: যেমনটি আগে বলা হয়েছে, শয়তানের কোনো মানুষকে জোর করার বা হাত ধরে পাপ করানোর ক্ষমতা নেই। শয়তানের ক্ষমতা কেবল 'কুপ্রস্তাব' দেওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্টিয়ারিং হুইল কিন্তু মানুষের নিজের হাতেই থাকে। পবিত্র কুরআনে কিয়ামতের দিনের একটি দৃশ্য বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে শয়তান নিজেই মানুষের সব দোষ খণ্ডন করে দেবে: "এবং যখন সব বিষয়ের ফয়সালা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, ...তোমাদের ওপর তো আমার কোনো আধিপত্য (জোর করার ক্ষমতা) ছিল না, আমি কেবল তোমাদের ডেকেছিলাম আর তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিলে। কাজেই তোমরা আমার ওপর দোষারোপ কোরো না, বরং নিজেদেরই দোষ দাও।" (সূরা ইব্রাহিম: ২২)

শয়তান কেবল একটি অপশন দেখায়, কিন্তু সেটি গ্রহণ করার পূর্ণ স্বাধীনতা মানুষের নিজের।

প্রশ্ন 2: আল্লাহ যদি আগে থেকেই জানেন (তাকদীর) আমি কালকে খুন বা চুরি করব, তবে তো আমার সেটা করা নির্ধারিতই ছিল। তাহলে আমার দোষ কোথায়?

উত্তর: আল্লাহর 'আগে থেকে জানা' আর আল্লাহর 'বাধ্য করা' এক জিনিস নয়। আল্লাহ সময়ের ঊর্ধ্বে। আমাদের জন্য যা অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যৎ, আল্লাহর কাছে তা এক সুনির্দিষ্ট বর্তমান। তিনি তাঁর অসীম শক্তি দিয়ে আগে থেকেই জানেন আপনি নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় কী সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি আপনার সিদ্ধান্ত জানেন বলেই তা লিখে রেখেছেন, তিনি লিখেছেন বলে আপনি সেই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন না। দায় সম্পূর্ণ আপনার।

প্রশ্ন 3: যদি মানুষের কোনো অপরাধ করার সময় আল্লাহর অনুমতি (Will) বা শারীরিক শক্তি সচল রাখা অপরিহার্য হয়, তবে তো পরোক্ষভাবে আল্লাহই সেই অপরাধটি ঘটার সুযোগ দিচ্ছেন। একজন অপরাধীকে অপরাধ করতে সাহায্য করা বা সুযোগ দেওয়াও তো এক ধরনের অপরাধের অংশীদার হওয়া (Complicity)। তাহলে স্রষ্টা কীভাবে নিরপরাধ বা পবিত্র থাকেন?

উত্তর: একটি দেশের সরকার বা রাষ্ট্র তার নাগরিকদের স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তার জন্য রাস্তাঘাট সচল রাখে, গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেয় এবং বাজারে ছুরি বা ধারালো অস্ত্র বিক্রির অনুমতি দেয়। এখন কোনো নাগরিক যদি সেই লাইসেন্স এবং ছুরি ব্যবহার করে কাউকে খুন করে, তবে আপনি কি দেশের সুপ্রিম কোর্ট বা সরকারকে 'খুনের অংশীদার' বলে জেলে দেবেন? কখনই না। কারণ সরকারের উদ্দেশ্য ছিল নাগরিকদের সুবিধা দেওয়া, খুন করা নয়।

আল্লাহ যদি মানুষের মন্দ ইচ্ছার সময় তার হাত অবশ করে দিতেন, তবে ভালো কাজের জন্য কোনো পুরস্কার (জান্নাত) দেওয়া সম্ভব হতো না। কারণ যেখানে পাপ করার কোনো সুযোগই নেই, সেখানে পুণ্য করার কোনো নৈতিক মূল্য থাকে না। আল্লাহ মানুষকে অপরাধ করার সাময়িক সুযোগ দেন পরীক্ষার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য, কিন্তু একই সাথে তিনি কিতাব এবং বিবেক পাঠিয়ে সেই অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী দিয়ে রেখেছেন। ফলে স্রষ্টা সম্পূর্ণ পবিত্র এবং ইনসাফকারী, আর অপরাধের পূর্ণ দায় একচ্ছত্রভাবে মানুষের নিজের।

প্রশ্ন 4: ধর্মীয় গ্রন্থে বলা হয়েছে মানুষের ভাগ্য বা তাকদির মহাবিশ্ব সৃষ্টির ৫০,০০০ বছর আগেই লেখা হয়ে গেছে (সহীহ মুসলিম: ২৬৫৩)। আবার আপনারা বলছেন দোয়ার মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন হয়। এটি কি একটি স্পষ্ট প্যারাডক্স (Logical Paradox) নয়? যা আগে থেকেই ফিক্সড, তা দোয়া দিয়ে কীভাবে বদলায়?

উত্তর: আপাতদৃষ্টিতে এটিকে প্যারাডক্স মনে হলেও, আল্লাহর 'পরম জ্ঞান' (Infinite Knowledge) এবং সময়ের মাত্রার গভীরতা বুঝলে এই ভুল ধারণা কেটে যায়। মানুষ সময়ের একটি রৈখিক রেখায় (Linear Time) বাস করে, যেখানে অতীত চলে যায় এবং ভবিষ্যৎ অজানা থাকে। কিন্তু আল্লাহর কাছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই, সব এক সুনির্দিষ্ট 'বর্তমান'। 

আল্লাহ যখন ৫০,০০০ বছর আগে আপনার তাকদির লিখেছিলেন, তখন তিনি আপনার স্বাধীন ইচ্ছার চূড়ান্ত প্রয়োগও জানতেন। তিনি তাঁর পরম জ্ঞান দিয়ে জানতেন যে—২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর আপনি একটি বড় বিপদে পড়বেন, এবং আপনি নিজের ইচ্ছায় হাত তুলে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া করবেন, আর আল্লাহ আপনার দোয়ার কারণে সেই বিপদটি দূর করে দেবেন। আল্লাহ আপনার 'দোয়া করার সিদ্ধান্ত' এবং সেই দোয়ার কারণে 'ভাগ্য পরিবর্তনের ফলাফল'—উভয়টি একসাথেই তাকদিরে লিখে রেখেছেন। 

অতএব, আপনার দোয়া তাকদিরের বাইরে কিছু নয়, বরং দোয়া নিজেই তাকদিরের একটি পূর্বনির্ধারিত অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন বলেছেন, "দোয়া ছাড়া অন্য কিছু ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে না" (সুনানে তিরমিযী: ২১৩৯), তার অর্থ হলো আল্লাহ দোয়ার মাধ্যমেই ভাগ্য পরিবর্তনের মেকানিজমটি সেট করে রেখেছেন। এখানে কোনো যৌক্তিক বৈপরীত্য নেই।

প্রশ্ন 5: আল্লাহ যদি পরম দয়ালু হন, তবে তিনি এমন একটা পরীক্ষাগার (পৃথিবী) বানালেনই বা কেন যেখানে মানুষ ভুল করে জাহান্নামে যাবে? তিনি পরীক্ষা ছাড়াই সবাইকে জান্নাতে দিয়ে দিলেই তো পারতেন!

উত্তর: পরীক্ষা ছাড়া সরাসরি কাউকে পুরস্কৃত করা বা শাস্তি দেওয়া চরম ইনসাফহীনতা। আল্লাহ মানুষকে রোবট হিসেবে সৃষ্টি করতে পারতেন যাদের কোনো স্বাধীন ইচ্ছা নেই (যেমন ফেরেশতারা)। কিন্তু তিনি এমন এক সৃষ্টি চাইলেন, যারা সম্পূর্ণ স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি পাওয়া সত্ত্বেও নিজের বিবেক ও বুদ্ধি খাটিয়ে ভালোবেসে স্রষ্টাকে সেজদা করবে। আর যেখানে স্বাধীনতা আছে, সেখানে পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী পুরস্কার (জান্নাত) এবং তিরস্কার (জাহান্নাম) থাকাটাই পরম ন্যায়বিচারের দাবি।

এখানেই শেষ নয়, এই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও পরীক্ষার চুক্তিটি যে কোনো অন্ধ একতরফা সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং সৃষ্টির শুরুতে আমাদের প্রতিটি রুহ বা আত্মা সশরীরে উপস্থিত থেকে এই চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেছিল—তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ লুকিয়ে আছে পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আহযাবের ৭২ ও ৭৩ নম্বর আয়াতে এবং এর চমৎকার ব্যাকরণগত গঠনে।

মহান আল্লাহ তাআলা এই চুক্তি ও মানুষের দায়বদ্ধতা প্রসঙ্গে বলেন: "আমি তো আসমান, যমীন ও পর্বতমালার প্রতি এ আমানত (স্বাধীন ইচ্ছা ও পরীক্ষার দায়িত্ব) পেশ করেছিলাম, কিন্তু তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং তাতে শঙ্কিত হলো, আর মানুষ তা বহন করল…" (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৭২)

"নিশ্চয়ই আমি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী এবং পর্বতমালা—সবার সামনে 'আমানত' (স্বাধীন ইচ্ছা ও পরীক্ষার দায়িত্ব) পেশ করেছিলাম; কিন্তু তারা এর দায়ভার বহন করতে অসম্মতি প্রকাশ করল এবং এর পরিণামের ভয়ে শঙ্কিত হলো। অথচ মানুষ তা বহন করল; নিশ্চয়ই সে (এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষাটি বেছে নিয়ে) নিজের ওপর একটি অসীম ভারী বোঝা চাপিয়েছিল এবং (দুনিয়ার পরীক্ষাগারে এসে সে যে পাপিষ্ঠ হয়ে নিজেকে ধ্বংস করতে পারে, সেই জাগতিক মনস্তাত্ত্বিক) পরিণাম সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসচেতন ছিল।" (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৭২)

ঠিক এর পরের আয়াতেই আল্লাহ এর আইনি ফলাফল ঘোষণা করে বলছেন: "যার ফলে আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী এবং মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারীদের শাস্তি দেবেন এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের তাওবা কবুল করবেন..." (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৭৩)

৭২ নম্বর আয়াতে ব্যবহৃত মূল শব্দটি হলো: ٱلْإِنسَٰنُ (আল-ইনসান)। এই একটি শব্দের ব্যাকরণের ভেতরেই লুকিয়ে আছে যে এখানে আদম এবং সমস্ত রুহকে একসাথে বোঝানো হয়েছে। আরবি গ্রামার অনুযায়ী, এখানে ‘ইনসান’ শব্দের শুরুতে যে ‘আলিফ-লাম’ (ال) যুক্ত আছে, তা হলো "আলিফ-লাম ইস্তিগরাক্বুল আফরাদ" (لام استغراق الأفراد)। আরবি ভাষার নিয়ম হলো—কোনো একবচন (Singular) শব্দের শুরুতে যখন এই বিশেষ 'আলিফ-লাম' বসে, তখন সেই শব্দটির একক অর্থ বিলুপ্ত হয়ে সমষ্টিগত অর্থ প্রকাশ করে। আর ঠিক এর পরের ৭৩ নম্বর আয়াতে এই আমানত বহনের ফলাফল প্রকাশ করতে আল্লাহ শব্দ ব্যবহার করছেন: "যার ফলে বা একারণে আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীদের এবং মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারীদের শাস্তি দিতে পারেন..."

এখানে ব্যাকরণগতভাবে "লি" (لِ - লামুল আক্বিবাহ) ব্যবহার করা হয়েছে, যার আইনি অর্থ হলো—"এর অনিবার্য ফলাফল বা দায় হিসেবে"।

পৃথিবীর যেকোনো বিচারব্যবস্থা ও আইনি ব্যাকরণ অনুযায়ী, চুক্তি বা অপরাধ যে করবে, পরীক্ষার ফলাফল বা শাস্তি তাকেই এককভাবে ভোগ করতে হবে। আমানত বা পরীক্ষা গ্রহণের চুক্তিটি যদি শুধু আদম একাই তাঁর নিজের জন্য বা এককভাবে করতেন, তবে আরবি ব্যাকরণের নিয়মে শাস্তি ও পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে কিয়ামত পর্যন্ত আসা কোটি কোটি সাধারণ মানুষের নাম আলাদা আলাদাভাবে এবং বহুবচনে (মুনাফিকীন, মুশরিকীন) আসত না। যেহেতু পরবর্তী আয়াতে ফল ভোগকারী হিসেবে প্রতিটি সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত দায় বা শাস্তির কথা স্পষ্টভাবে এসেছে, তাই ব্যাকরণের অকাট্য নিয়মে প্রমাণিত যে—আমানত বা চুক্তি গ্রহণের সময় 'আল-ইনসান' শব্দের অধীনে আমরা প্রত্যেকে আমাদের আলাদা স্বাধীন রুহ ও চেতনা নিয়ে সেখানে সশরীরে উপস্থিত ও সম্মত ছিলাম।

অতএব, মানুষ আজ দুনিয়াতে এসে নিজের জাগতিক মেমোরি থেকে রুহের জগতের কথা ভুলে গেছে (যা মানুষের নামের আরেকটি অর্থ 'নিসিয়ান' বা বিস্মৃতি থেকে এসেছে এবং যা পরীক্ষার নিরপেক্ষতার জন্য আবশ্যিক)। কিন্তু মানুষ ভুলে গেলেও, সৃষ্টির শুরুতে আমাদের প্রতিটি রুহ স্বেচ্ছায় এই স্বাধীনতার আমানত গ্রহণ করেছিল। সুতরাং, নিজের চুক্তির পরীক্ষা থেকে পালানোর কোনো আইনি বা যৌক্তিক সুযোগ মানুষের নেই। আর এই কারণেই, পরীক্ষা ছাড়া সরাসরি কাউকে জান্নাত বা জাহান্নাম দেওয়া আল্লাহর পরম ন্যায়বিচার ও ইনসাফের পরিপন্থী।

প্রশ্ন 6: স্রষ্টা বা আল্লাহ যদি সত্যিই থাকেন, তবে তিনি মানুষের চোখের সামনে কেন অদৃশ্য (লুকিয়ে) থাকেন? কোনো নিখাদ বা সরাসরি প্রমাণ না দিয়ে, হাজার বছরের পুরনো ধর্মগ্রন্থ ও ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে মানুষকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে বলা কি একজন পরম ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু স্রষ্টার পক্ষে যৌক্তিক আচরণ?

উত্তর: আল্লাহ যদি আকাশে দৃশ্যমান হয়ে মেঘের অক্ষরে লিখে রাখতেন "আমিই আল্লাহ, আমাকে সেজদা করো", তবে পৃথিবীর কোনো মানুষ নাস্তিক হতো না। এমনকি কট্টর অপরাধীরাও ভয়ে দিনরাত সেজদায় পড়ে থাকত। তখন মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি বিলুপ্ত হয়ে যেত এবং মানুষ রোবটে পরিণত হতো। ইসলামে পরীক্ষার শর্ত হলো, চোখের সামনে স্রষ্টাকে সরাসরি না দেখেও, মহাবিশ্বের ডিজাইন দেখে নিজের বিবেক ও বুদ্ধি খাটিয়ে স্রষ্টাকে চিনে নেওয়া।

একজন বিজ্ঞানী যখন কণা বা গ্যালাক্সি নিয়ে গবেষণা করে স্রষ্টাকে খুঁজে পান না, তখন ভুলটা বিজ্ঞানের নয়, ভুলটা তার 'অনুসন্ধান পদ্ধতির'। বিজ্ঞান কেবল উপাদান (Matter) এবং প্রাকৃতিক নিয়ম (Laws of Nature) নিয়ে কাজ করে। বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে মহাবিশ্ব 'কীভাবে' কাজ করে, কিন্তু বিজ্ঞান কখনো উত্তর দিতে পারে না মহাবিশ্ব 'কেন' অস্তিত্বে এলো। 

অনেকে বলতে পারে, "হাজার হাজার বছর ধরে ধর্মের নামে মানুষ একে অপরকে হত্যা করেছে এবং শত শত ধর্ম তৈরি হয়েছে, তাই প্রশ্নপত্র অস্পষ্ট।" কিন্তু ইসলামের ইতিহাস এবং দর্শন এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দেয়: ইসলাম বলে না যে মুহাম্মদ (সা.)-ই প্রথম ধর্মের প্রচারক। বরং সৃষ্টির শুরু থেকে আদম, নূহ, ইব্রাহিম, মুসা, ঈসা (আলাইহিমুস সালাম) সহ ১ লক্ষ ২৪ হাজার নবী-রাসূল একই মৌলিক বার্তা নিয়ে এসেছিলেন—"স্রষ্টা এক, তাঁর কোনো শরিক নেই এবং মৃত্যুর পর হিসাব দিতে হবে।"

মূল প্রশ্নপত্রটি সবসময় পরিষ্কার ছিল। কিন্তু মানুষ নিজেদের স্বার্থ, ক্ষমতা এবং গোত্রীয় অহংকারের কারণে পূর্ববর্তী কিতাবগুলো পরিবর্তন করে শত শত উপ-ধর্ম ও মতবাদ তৈরি করেছে। পূর্ববর্তী কিতাবগুলো মানুষ বিকৃত করার পর, আল্লাহ মানবজাতির জন্য চূড়ান্ত গাইডবুক হিসেবে 'আল-কুরআন' অবতীর্ণ করেন এবং এর সুরক্ষার দায়িত্ব নিজেই নেন (সূরা আল-হিজর: ৯)।

অনেকে মনে করতে পারেন, ধর্ম মানেই অন্ধ বিশ্বাস। কিন্তু পবিত্র কুরআনের শত শত আয়াতে আল্লাহ মানুষকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে নিষেধ করেছেন, বরং চিন্তা ও গবেষণা করার নির্দেশ দিয়েছেন। “নিশ্চয়ই আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানবানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা আলে ইমরান: ১৯০)।

প্রশ্ন 7: পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধবিগ্রহ বা সংকটের কারণে নিষ্পাপ ও নিরপরাধ শিশুরা যে চরম কষ্ট, নির্যাতন ও অপরাধের শিকার হচ্ছে—এর পেছনে কী ধরনের মহাজাগতিক কল্যাণ থাকতে পারে? বিশ্বজুড়ে শিশুদের এই অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের পরও স্রষ্টার পরম ন্যায়পরায়ণতা ও নৈতিকতা কীভাবে বজায় থাকে?

উত্তর: অনেকে যেখানে ভুল করেন তা হলো, তারা মানুষের করা অপরাধের দায় স্রষ্টার ওপর চাপিয়ে দেন। যুদ্ধবিগ্রহে যে বোমাটি পড়ছে, সেটি কি আকাশ থেকে প্রাকৃতিকভাবে ঝড়-বৃষ্টির মতো পড়ছে? নাকি একজন মানুষ তার লোভ, ক্ষমতা এবং স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ব্যবহার করে বোমার বোতামটি চাপছে? আল্লাহ মানুষকে রোবট বানাননি, তাকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। এখন মানুষ যদি সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করে একে অপরকে খুন বা ধর্ষণ করে, তবে তার দায় মানুষের, স্রষ্টার নয়। যদি স্রষ্টা প্রতিবার একজন অত্যাচারীর হাতকে অলৌকিকভাবে অবশ করে দিতেন, তবে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিটাই মিথ্যা হয়ে যেত এবং এই পৃথিবী কোনো পরীক্ষাগার থাকত না।

প্রশ্ন 8: প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিরপরাধ শিশুদের মৃত্যুর যৌক্তিকতা কী? তারা তো কোনো পাপ করেনি, তাদের পরীক্ষা নেওয়ারও তো কোনো প্রয়োজন নেই!

উত্তর: ইসলাম স্পষ্ট করে যে, সাবালক হওয়ার আগে কোনো শিশু মারা গেলে তার কোনো হিসাব বা পরীক্ষা নেই। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন: "তিন শ্রেণীর মানুষ থেকে কলম তুলে নেওয়া হয়েছে (অর্থাৎ তাদের পাপ-পুণ্য লেখা হয় না): …শিশু যতক্ষণ না বড় (সাবালক) হয়…।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৩৯৮)। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বা যেকোনো কারণে শৈশবে মারা যাওয়া শিশুরা কোনো পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি জান্নাতে প্রবেশ করবে।

দুনিয়ার কয়েক মুহূর্তের কষ্ট সহ্য করে যদি একটি শিশু কোনো পরীক্ষা বা হিসাবের মুখোমুখি না হয়ে সরাসরি চিরস্থায়ী জান্নাত পেয়ে যায়, তবে সেটি তার জন্য কোনো 'জুলুম' নয়, বরং এক পরম অনুগ্রহ। ইসলামের সমীকরণে এটি শিশুর জন্য এক মহাসাফল্য। শিশুদের এই কষ্ট বা মৃত্যু মূলত তাদের পিতা-মাতা এবং চারপাশের মানুষের জন্য এক চরম পরীক্ষা। তারা এই কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর ওপর আস্থা হারায় নাকি ধৈর্য ধারণ করে—তা দেখার জন্য এটি একটি পার্থিব পরীক্ষা।

প্রশ্ন 9: কিছু মানুষ বলে, বিজ্ঞান নাকি বলে, মানুষ লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের ফল। আদিম প্রাক-মানুষেরা (যেমন হোমো ইরেক্টাস) বর্বরোচিত জীবন কাটাত, ধর্ম বা নৈতিকতা বুঝত না। তাহলে কোটি কোটি বছর ধরে যে অগণিত আদিম মানুষ লড়াই করে মারা গেল, তাদের পরীক্ষার খাতাটা কোথায়? ধর্মীয় টাইমলাইনের সাথে বিজ্ঞানের এই বিরাট ফারাকের জবাব কী?

উত্তর: অনেক মুসলিম বিজ্ঞানী এবং মুফাসসিরীন (যেমন আল্লামা ইবনে কাসীর তাঁর 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া' গ্রন্থে) উল্লেখ করেছেন যে, আদম (আ.)-এর পূর্বেও পৃথিবীতে 'হিন' ও 'বিন' নামক কিছু সৃষ্টি ছিল, যারা রক্তপাত ও বিপর্যয় সৃষ্টি করত। আধুনিক বিজ্ঞান যে হোমো ইরেক্টাস, নিয়ান্ডারথাল বা অন্যান্য হোমিনিনদের কথা বলে, তারা জৈবিকভাবে মানুষের মতো দেখতে হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে তারা 'রুহ' (ঐশী আত্মা) এবং 'স্বাধীন ইচ্ছাসম্পন্ন জবাবদিহিতামূলক বুদ্ধি' (Accountable Intellect) প্রাপ্ত 'আদম সন্তান' ছিল না। তারা ছিল প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণীর মতোই প্রাকৃতিক নিয়মে বিবর্তিত ও বিলুপ্ত হওয়া সৃষ্টি। প্রাণীদের কোনো পরীক্ষা বা পাপ-পুণ্যের খাতা থাকে না।

ইসলামে বিচার বা পরীক্ষার মূল শর্ত হলো, বিবেক-বুদ্ধি এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা। প্রাক-মানবেরা যখন চার পায়ে বা অর্ধ-সোজা হয়ে বর্বরোচিত জীবন কাটাত, তখন তারা বনের পশুপাখির মতোই ছিল। তাদের ক্ষুধা, বেঁচে থাকার লড়াই এবং মৃত্যু ছিল প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম, যেমনটি একটি ডাইনোসর বা বাঘের ক্ষেত্রে ঘটে। ইসলাম বলে, আল্লাহ যখন প্রথম মানব আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন এবং তাঁর ভেতর বিশেষ 'রুহ' ফুঁকে দিলেন, ঠিক তখন থেকেই পৃথিবীতে নৈতিকতা, এবং পরীক্ষার সূচনা হয়েছে।

যদি কোনো আদিম মানবগোষ্ঠী আদম (আ.)-এর পরবর্তী সময়েও পৃথিবীর কোনো প্রান্তে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং জ্ঞানহীন অবস্থায় জীবন কাটিয়ে থাকে, তবে তাদের বিষয়ে আল্লাহর স্পষ্ট নীতি হলো: "আমি কোনো রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকেই শাস্তি দিই না।" (সূরা আল-ইসরা: ১৫)। 

প্রশ্ন 10: খিজির (আ.) এক কিশোরকে হত্যা করেছিলেন কারণ আল্লাহ বলেছিলেন কিশোরটি বড় হয়ে পাপী ও কাফের হবে। যদি কিশোরটি ছোটবেলাতেই মারা যায়, তবে 'সে বড় হয়ে পাপী হবে' আল্লাহর এই অগ্রিম জ্ঞানটি কি মিথ্যা প্রমাণিত হলো না? এখানে কি দুটি বিপরীত ঘটনা ঘটছে না?"

উত্তর: এখানে কোনো বৈপরীত্য নেই এবং আল্লাহর কোনো জ্ঞানও মিথ্যা হয়নি। লজিক, দর্শন এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সে একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা রয়েছে, যাকে বলা হয় Counterfactual Definiteness বা সমান্তরাল বাস্তবতার জ্ঞান। এর অর্থ হলো, একটি ঘটনা বাস্তবে যেভাবে ঘটেছে তার জ্ঞান যেমন থাকা সম্ভব, তেমনি ঘটনাটি যদি অন্য কোনো বিকল্প উপায়ে ঘটত, তবে তার নিখুঁত ফলাফল কী হতো, সেই জ্ঞানও থাকা সম্ভব।

আল্লাহ যেহেতু সময়ের স্রষ্টা, তাই তিনি সময়ের কোনো রৈখিক রেখায় (Linear Timeline) বন্দী নন। তিনি সময়ের সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে অবস্থান করে একই সাথে অসীম বা অসংখ্য সমান্তরাল টাইমলাইনের নিখুঁত জ্ঞান সৃষ্টির শুরু থেকেই রাখতেন।

মানুষ তার জীবনের প্রতি সেকেন্ডে যে স্বাধীন সিদ্ধান্তগুলো নেয়, তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের কারণে ভবিষ্যতের হাজার হাজার নতুন পথ বা টাইমলাইন (Timeline 1, 2, 3, 4...) তৈরি হতে পারে। মানুষ যদি সিদ্ধান্ত 'ক' নেয় তবে তার ভবিষ্যৎ কেমন হবে, আর সিদ্ধান্ত 'খ' নিলে জীবন কোন দিকে মোড় নিত—আল্লাহর পরম জ্ঞান এই প্রতিটা সম্ভাব্য মোড়ের শেষ সীমানা পর্যন্ত কী আছে, তা নিখুঁতভাবে জানে। আল্লাহর জ্ঞান অসীম বলেই তিনি অসীম সংখ্যক সমান্তরাল বাস্তবতার খবর রাখেন।

খিজির (আ.)-এর সেই কিশোরটির ক্ষেত্রে আসল সমীকরণ ও সমন্বয়:

টাইমলাইন-B (সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ): কিশোরটি যদি বেঁচে থাকত এবং বড় হওয়ার সুযোগ পেত, তবে তার সামনেও কিন্তু অসংখ্য টাইমলাইন খোলা ছিল। সে হয়তো বড় হয়ে ডাকাত হতে পারত (Timeline 1), সে হয়তো বড় হয়ে খুনি হতে পারত (Timeline 2), কিংবা সে হয়তো বড় হয়ে কোনো কুফরি মতবাদের নেতা হতে পারত (Timeline 3)। কিন্তু এই অসংখ্য সম্ভাব্য টাইমলাইনের (Timeline 1, 2, 3, 4...) সবগুলোর মধ্যে একটি বিষয় শতভাগ কমন বা সাধারণ ছিল—তা হলো, সে নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় ও মুক্ত চিন্তায় যে পথেই যাক না কেন, সে একজন চরম অবাধ্য কাফের ও জালেম হতো এবং তার মুমিন পিতা-মাতাকে কুফরি দিয়ে অতিষ্ঠ করে ধ্বংস করে ছাড়ত। আল্লাহর পরম জ্ঞান এই অসীম সম্ভাব্য টাইমলাইনগুলোকে ১০০% নিশ্চিতভাবে জানত।

টাইমলাইন-A (বাস্তব অতীত ও ভবিষ্যৎ): কিন্তু আল্লাহ তাঁর পরম প্রজ্ঞায় সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি এই শিশুটিকে ওই অসংখ্য খারাপ বা ধ্বংসাত্মক টাইমলাইনের কোনোটাতেই প্রবেশ করতে দেবেন না। তিনি খিজির (আ.)-কে পাঠিয়ে শিশুটিকে শৈশবেই তুলে নিলেন। ফলে বাস্তবে কার্যকর হলো টাইমলাইন-A, যেখানে শিশুটি নিষ্পাপ অবস্থায় মারা গেল এবং সরাসরি জান্নাত পেল।

অনেকেই হয়তো ভাবছেন, যদি শিশুটি ছোটতেই মারা যায়, তবে "সে বড় হয়ে পাপী হবে" আল্লাহর এই কথাটি মিথ্যা হয়ে গেল। কিন্তু লজিক্যালি এটি মোটেও মিথ্যা নয়। এখানে দুটি ভিন্ন টাইমলাইনের সমান্তরাল জ্ঞান প্রকাশ পেয়েছে, কোনো বৈপরীত্য ঘটেনি। আল্লাহর জ্ঞানটি কোনো একমুখী বা অন্ধ নিয়তিবাদ (Determinism) ছিল না। আল্লাহর জ্ঞানটি ছিল এইরকম: "বাস্তবে ঘটবে টাইমলাইন-A (শৈশবে মৃত্যু), কিন্তু যদি টাইমলাইন-B এর যেকোনো একটি পথও ঘটত (বড় হওয়ার সুযোগ পেত), তবে সে (তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়ে) পাপী হতো।"

অতএব, আল্লাহর জ্ঞান বা বাণী বিন্দুমাত্র মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি। আল্লাহর জ্ঞান ছিল "সুযোগ পেলে কিশোরটি নিজের স্বাধীন ইচ্ছার কোটি কোটি সম্ভাব্য পথে কী করত" তা নিয়ে, আর আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালা ছিল "তাকে সেই সুযোগ না দিয়ে টাইমলাইন-A এর মাধ্যমে জান্নাতে তুলে নেওয়া" তা নিয়ে। একটি ছিল মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার সম্ভাব্য করুণ পরিণতি, আর অন্যটি ছিল স্রষ্টার পরম দয়ার চূড়ান্ত রূপ।

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, "তাকদিরে কি তাহলে দুটি বিপরীত ঘটনা লেখা ছিল?"

না, তাকদিরে বা লাওহে মাহফুজে কখনোই দুটি বিপরীত ফলাফল লেখা থাকে না। আল্লাহর পরম জ্ঞানে (যা সময়ের ঊর্ধ্বে) শুরু থেকেই লেখা ছিল যে—"এই কিশোরটি জন্ম নেবে, সে বড় হলে পাপী হতো, কিন্তু খিজির (আ.)-এর মাধ্যমে তাকে শৈশবেই মৃত্যু দেওয়া হবে এবং সে নিষ্পাপ অবস্থায় জান্নাতে যাবে।"

তাহলে আল্লাহ খিজির (আ.)-কে কেন বললেন যে সে বড় হলে পাপী হবে? 

খিজির (আ.) তো আর অন্তর্যামী বা গায়েব জানতেন না। তাকে যদি আল্লাহ এই 'শর্তসাপেক্ষ ভবিষ্যৎ' না জানাতেন, তবে খিজির (আ.) একটি নিষ্পাপ শিশুকে মৃত্যুর পেছনে আল্লাহর "মহাজাগতিক বৃহত্তর কল্যাণ" ও পরম ইনসাফটি বুঝতে পারতেন না। খিজির (আ.)-কে যুক্তিটি বোঝানোর জন্যই আল্লাহ কিশোরটির বড় হওয়ার পরের কুফরি মানসিকতার জ্ঞানটি প্রকাশ করেছিলেন। অনেকে এই ঘটনাকে নিষ্ঠুরতা মনে করতে পারে, কিন্তু ইসলামের সমীকরণে এটি এক পরম দয়া। কিশোরটি যদি বড় হয়ে নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় কাফের ও পাপী হতো, তবে সে অনন্তকাল জাহান্নামের আগুনে পুড়ত। কিন্তু আগে মারা যাওয়ার কারণে সে কোনো হিসাব ছাড়াই সরাসরি চিরস্থায়ী জান্নাতের বাসিন্দা হয়ে গেল।




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কেন ! মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) কে শিশু ধর্ষক বা শিশু কামী বলা যাবে না!

আমরা যারা মুসলিম সবাই এই একটি কথা অবশ্যই বিশ্বাস করি সেটা হল পবিত্র কুরআনে যা বলা আছে তা একশত ভাগ সত্য। কিন্তু অবশ্যই কর্তব্য এমন একটি কাজ আছে যেটা করার সময় আমাদের  অনেকেরই হয় না আমাদের দৈনন্দিন ব‍্যস্ততার কারণে। আর সেই কাজটি হল পবিত্র কুরআনে যা বলা আছে তা বাস্তবিক জীবনে প্রয়োগ করা। পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদীস ঠিক মত না জানার কারণে আমরা অনেকেই বিভ্রান্তির শিকার হই কিছু মানুষের দ্বারা যারা পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদীস দিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, আমরা সঠিকভাবে পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদীস না জানার কারণে এই বিভ্রান্তির শিকার হই। অনেক বিভ্রান্তিকর প্রশ্নগুলোর মধ‍্যে একটি স্পর্শকাতর প্রশ্ন যেটা ইনশাআল্লাহ আজকে আলোচনা করব। প্রশ্নঃ মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) কি শিশু ধর্ষক বা শিশু কামী ছিলেন? উত্তরঃ মূল বক্তব্যঃ রাসূল (সা.) এর ইন্তেকালের সময় সাহাবীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ চৌদ্দ হাজার। তাদের সব সময় রাসূল (সা.) এর কাছে থেকে তাঁর সকল কথা শুনা বা সকল কাজ দেখা সম্ভব ছিল না। তাই অধিকাংশ সাহাবীর জানা থাকা হাদীসের মধ্যে কিছু ছিল রাসূল (সা.) এর নিকট থেকে সরাসরি শুনা বা...

ইসলাম ধর্ম দাসপ্রথাকে কিভাবে মানবিক করেছে

আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ লোকেরই ইসলামে দাস দাসী নিয়ে খারাপ ধারণা আছে আবার এমন অনেকে আছেন এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে মন থেকে জবাব দিতে পারি না এমনকি হুজুরের জবাবেও মনে শান্তি পাই না। এর ফলে আস্তে আস্তে অনেকেরই ইসলামের প্রতি বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। তারা ধৈর্য্য সহকারে এই লেখাটি পড়ার অনুরোধ রইল আশা করি এ বিষয়ে পরিস্কার ধারণা আসবে এবং inshAllah, অন্যকে বিভ্রান্ত থেকে বাঁচাতে পারবেন। ইসলাম দাস প্রথার প্রবর্তক নয়; খুব সম্ভবত সেই আদিম বর্বরতার যুগে দাস প্রথার উৎপত্তি হয়েছিল এবং তা লিখিত ইতিহাসের পুরোটা ব্যাপী বিশ্বের প্রধান প্রধান সভ্যতার বৈশিষ্ট্য ছিল। দাস প্রথা ব্যাবিলনিয়া এবং মেসোপটেমিয়াতেও প্রচলিত ছিল। খ্রিস্টান ধর্মের আবির্ভাবের পূর্বে প্রাচীন মিশর, গ্রীস ও রোমিও দাস প্রথা বিশেষ লক্ষনীয় ছিল। দাসত্ব (ইংরেজি: Slavery বা Thralldom) বলতে বোঝায় কোনো মানুষকে জোরপূর্বক শ্রম দিতে বাধ্য করা, এবং এক্ষেত্রে কোনো মানুষকে অন্য মানুষের অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। সাধারণত দুই ভাবে দাস দাসী হয়। যেমনঃ ✅ একঃ অভাব, দুর্ভিক্ষ, নদী ভাঙন, পরিবারের উপার্জনকারী সদস্যের মৃত্যু প্রভৃতি দুর্যোগ কবলিত ব্...

কে গাণিতিক হিসাবে এগিয়ে? সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী না সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসী! [অংক ও সমাধান]

কাল্পনিক দুইটি নাম (রাহি, মাশা) দিয়ে একটি অংক বুঝার চেষ্টা করি যেখানে আমরা বুঝতে পারব সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী ও সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসীর মধ্যে কে বেশি লাভবানঃ ধরি, মাশা = সৃষ্টিকর্তায় অবিশ্বাসী রাহি = সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী মাশার স্ত্রীর নাম = মাহি রাহির স্ত্রীর নাম = রানু বি. দ্রঃ রাহি ও মাশা একটি কোম্পানিতে প্রায় একই বয়সে (ধরি, ২৫ বছর বয়সে) একই সাথে খুব ছোট পোস্টে যোগদান  করে (কারণ তাদের পড়াশুনা খুবই কম ছিল) এবং তাদের বেতন সমান। পড়াশুনা খুবই কম থাকার কারণে তাদের বছরের পর বছর কাজ করার পরেও কোন প্রমোশন হচ্ছিল না। সৃষ্টিকর্তাকে অবিশ্বাস করার ফলে কোন ভয় না করে মাশা চাকরির পাশাপাশি অল্প কিছু টাকা দিয়ে সুদের ব‍্যবসা সহ লোক ঠকানোর কাজ শুরু করল এবং এই অবৈধ ব‍্যবসা থেকে আস্তে আস্তে লাভও হতে শুরু করল। অপরদিকে, সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করার কারণে রাহি চাকরির পাশাপাশি নিজে কষ্ট করে হলেও গরিবদের সাহায্য করত, সৎ পথে চলত, সুদ থেকে দূরে থাকত, কোনো হারাম আয় করত না এবং আল্লাহর আদেশ-নিষেধ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলত। রানু ও মাহি বান্ধবী। হঠাৎ তারা কি মনে করে একটি সিদ্ধান্তে আসল। সিদ্ধান্তটি হল, যদি...

কেন সৃষ্টিকর্তার বা আল্লাহর বা ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ জানা জরুরী?

অনেকেই আপনাকে বিভ্রান্তিতে ফেলতে পারে এমনকি আপনার নিজেরও হঠাৎ সন্দেহ হতে পারে সৃষ্টিকর্তা আছে কি নাই। 💎 ইসলামিক যুক্তিঃ 💭 হযরত ইমাম আবু হানিফার একটা ঘটনা, একদিন বিতর্ক অনুষ্ঠানে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণের উদ্দেশ্যে তাকে দাওয়াত করা হয়েছিল তিনি নির্ধারিত সময়ের অনেক বিলম্বে সভাস্থলে উপস্থিত হওয়ায় তাকে প্রশ্ন করা হলো, আপনি এত দেরিতে কেন আসলেন? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন আমার আসার পথে একটা নদী থাকায় ও নদীতে কোনো নৌকা ও মাঝি না থাকায় অনেক অপেক্ষা করার পর দেখলাম হঠাৎ একটা গাছ আপনি-আপনি মাটিতে কয়েক খন্ড হয়ে পড়ে গেল তা আপনি-আপনি তখতাতে পরিণত হয়ে জোড়া লেগে নৌকা হয়ে আমাকে নদী পার করে আমাকে এ পার নামিয়ে দিল এ কারণে আমার আসতে অনাকাঙ্খিত দেরি হয়ে গেছে। এ জবাব শুনার পর সভায় উপস্থিত এক নাস্তিক পন্ডিত প্রশ্ন করেন আপনি তো একজন পাগল ছাড়া আর কিছু নন। এরূপ অসম্ভব অবাস্তব কোন কর্মকান্ড কি কোন দিন কোথা ও কোন সুদক্ষ কর্মকার ব্যতীত হতে পারে? নাস্তিক পন্ডিতদের এ কথার জবাবে  ইমাম হানিফা (রহঃ) বললেন তাহলে আপনি বলুন সামান্য একখানা নৌকা তৈরি বা সৃষ্টি হতে যদি কোন সুদক্ষ মিস্ত্রি বা কর্মকার ছাড়া সম্ভব না হয় তাহ...

অনেকেই বলে কোরআনে সূরা তালাকের ৪ নম্বর আয়াতে আছে, ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি এরকম মেয়েকে বিয়ে করা যায়েজ। কথাটি সত‍্য নাকি মিথ্যা !

🌿 প্রশ্নঃ অনেকেই বলে কোরআনে সূরা তালাকের ৪ নম্বর আয়াতে আছে, ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি এরকম মেয়েকে বিয়ে করা যায়েজ। কথাটি সত‍্য নাকি মিথ্যা ! উত্তরঃ সূরা আত-ত্বলাক্ব এর ৪ নম্বর আয়াতঃ " তোমাদের যেসব স্ত্রীদের মাসিক হবার আশা নেই, তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা সন্দেহ করলে তাদের ইদ্দতকাল হবে তিন মাস এবং যাদের এখনো মাসিক হয়নি তাদেরও।[1] আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত।[2] আল্লাহকে যে ভয় করবে, তিনি তার সমস্যার সমাধান সহজ করে দেবেন। " N.B:  ইদ্দতঃ স্ত্রী তালাক প্রাপ্তা হলে বা তার স্বামীর মৃত্যু হলে, স্ত্রী গর্ভবতী হয় কিনা দেখার জন‍্য যে সময় উক্ত স্ত্রীকে এক বাড়ীতে থাকতে হয়, অন্যত্র যেতে পারে না বা অন্য কোথাও বিবাহ বসতে পারে না তাকে “ইদ্দত” বলে। 🌿 তাফসীরে আহসানুল বায়ানঃ [1] এ হল সেই মহিলাদের ইদ্দত, যাদের বার্ধক্যের কারণে মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে অথবা যাদের এখনোও মাসিক আরম্ভ হয়নি। জ্ঞাতব্য যে, বিরল হলেও এমনও হয় যে, মেয়ে সাবালিকা হয়ে যায়, অথচ তার মাসিক আসে না। [2] তালাকপ্রাপ্তা মহিলা যদি গর্ভবতী হয়, তবে তার ইদ্দত হল সন্তান প্রসব করা সময় পর্যন্ত, যদিও সে তালাকের ...

আমার সম্পর্কে

আমার ফটো
সত্য কথা
I have an interest in writing about the real truth of Islam. Study: I have completed BSC Engineering.