কুরআন কিন্তু কোথাও ফিক্সড পার্সেন্টেজ বা দশমিকের হিসাব দেয়নি, বরং অংশীদারদের পারস্পরিক অনুপাত (Ratio) বা ভগ্নাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে।
কুরআনের ভগ্নাংশগুলো যদি আমরা একটু দেখি:
মেয়েরা ২/৩,
বাবা ১/৬,
মা ১/৬ এবং
স্ত্রী ১/৮
গণিতের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, আলাদা আলাদা ভগ্নাংশকে একসঙ্গে হিসাব করতে হলে প্রথমে তাদের হরগুলোর (নিচের সংখ্যাগুলোর) লসাগু (LCM) বের করতে হয়। ৩, ৬, ৬ এবং ৮ এর লসাগু হলো ২৪।
এখন নিয়ম হলো, এই লসাগু (২৪) কে প্রতিটি ভগ্নাংশের নিচের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করে, ভাগফলকে উপরের সংখ্যা দিয়ে গুণ করা। সেই নিয়মে কার কত ভাগ আসে দেখুন:
মেয়েরা পাবে: (২৪ ÷ ৩) × ২ = ১৬ ভাগ
বাবা পাবেন: (২৪ ÷ ৬) × ১ = ৪ ভাগ
মা পাবেন: (২৪ ÷ ৬) × ১ = ৪ ভাগ
স্ত্রী পাবেন: (২৪ ÷ ৮) × ১ = ৩ ভাগ
এখন এই সবগুলো ভাগ যোগ করলে মোট যোগফল হয়: ১৬ + ৪ + ৪ + ৩ = ২৭ ভাগ।
সহজ কথায়, মূল সম্পত্তি ছিল ২৪ ভাগের, কিন্তু দাবিদারদের অনুপাতের মোট যোগফল হয়ে গেছে ২৭। এখন সম্পত্তি তো আর অলৌকিকভাবে টেনে বড় করা সম্ভব না, তাই গণিতের নিয়ম হলো, সবার পারস্পরিক অনুপাত ঠিক রেখে মূল সম্পত্তিকে ২৪ ভাগের বদলে ২৭ ভাগ করে ফেলা।
যেমন ধরুন, একটি কেক ৪ জন মানুষের মধ্যে সমান ৪ ভাগে ভাগ করার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আরও ১ জন মেহমান চলে আসায় মানুষ হলো ৫ জন। এখন কি কেক কাটা ভুল ছিল? অবশ্যই না। নিয়ম হলো, কেকের সাইজ ঠিক রেখে ওটিকে এখন ৪ ভাগের বদলে ৫ ভাগ করতে হবে, যাতে প্রত্যেকে সমানভাবে আগের চেয়ে সামান্য কম পায়।
ঠিক এই নিয়মেই নিচের অংশগুলো তৈরি হয়েছে:
মেয়েরা পাবে: ২৭ ভাগের ১৬ ভাগ (১৬/২৭ অংশ)
বাবা পাবেন: ২৭ ভাগের ৪ ভাগ (৪/২৭ অংশ)
মা পাবেন: ২৭ ভাগের ৪ ভাগ (৪/২৭ অংশ)
স্ত্রী পাবেন: ২৭ ভাগের ৩ ভাগ (৩/২৭ অংশ)
এখানে আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে—
আগে মেয়েদের অংশ ছিল ২/৩ (বা ০.৬৬),
এখন হয়ে গেল ১৬/২৭ (বা ০.৫৯),
তাহলে রেশিও বা অনুপাত ঠিক থাকল কীভাবে?
মোট সম্পত্তি প্রয়োজনের চেয়ে কম হলে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অংশ (০.৬৬ থেকে কমে ০.৫৯) কিছুটা কমবে, কিন্তু তাদের নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক অনুপাত বা ক্ষমতার ভারসাম্য ১০০% অপরিবর্তিত থাকবে।
চলুন এটার গাণিতিক প্রমাণ দেখি:
কুরআনের মূল হিসেব অনুযায়ী অনুপাত ছিল,
১৬ : ৪ : ৪ : ৩
এই মূল নিয়ম অনুযায়ী:
১. বাবার চেয়ে মেয়েরা কতগুণ বেশি পাওয়ার কথা?
(১৬ ÷ ৪) = ঠিক ৪ গুণ বেশি।
২. স্ত্রীর চেয়ে মেয়েরা কতগুণ বেশি পাওয়ার কথা?
(১৬ ÷ ৩) = ঠিক ৫.৩৩ গুণ বেশি।
৩. বাবার চেয়ে মা কতটুকু পাবেন?
(৪ ÷ ৪) = একদম সমান সমান।
এবার প্রপোশনাল রিডাকশনের পর আমাদের নতুন ভগ্নাংশগুলো (১৬/২৭, ৪/২৭, ৪/২৭, ৩/২৭) দিয়ে ভাগ করে দেখুন তো অনুপাত ঠিক আছে কি না:
১. বাবার চেয়ে মেয়েরা কতগুণ বেশি পাচ্ছে?
(১৬/২৭ ÷ ৪/২৭) = ১৬/৪ = ঠিক ৪ গুণ বেশি!
২. স্ত্রীর চেয়ে মেয়েরা কতগুণ বেশি পাচ্ছে?
(১৬/২৭ ÷ ৩/২৭) = ১৬/৩ = ঠিক ৫.৩৩ গুণ বেশি!
৩. বাবার চেয়ে মা কতটুকু পাচ্ছেন?
(৪/২৭ ÷ ৪/২৭) = একদম সমান সমান!
দেখেছেন? একেই বলে 'অনুপাত ঠিক রাখা'। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অংশ কিছুটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু আল্লাহর দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী একে অপরের তুলনায় কে কত গুণ বেশি বা কম পাবেন—সেই পারস্পরিক ক্ষমতার ভারসাম্য এক সুতোও পরিবর্তন হয়নি।
এবার স্কুলের সাধারণ গণিতের নিয়মে এই নতুন ভগ্নাংশগুলো যোগ করে দেখুন:
(১৬ + ৪ + ৪ + ৩) / ২৭ = ২৭/২৭ = ১
(অর্থাৎ সম্পূর্ণ সম্পত্তি বা ১০০%)।
এখানে যদি কেউ ক্যালকুলেটরে দশমিক দিয়ে হিসাব করতে যায়, তবে ক্যালকুলেটরের সীমাবদ্ধতার কারণে দশমিকের পর সামান্য রাউন্ডিং এরর আসতে পারে, যা গণিতের যেকোনো দশমিক রূপান্তরের ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক। কিন্তু মূল ভগ্নাংশের হিসেবে এটি একদম নিখুঁত ১ বা ১০০%।
উদাহরণ:
ধরুন, চার ভাই মিলে পৈতৃক সূত্রে মোট ২৪ বিঘা জমি পেলেন। বড় ভাই ১৬ বিঘা, মেজো ভাই ৪ বিঘা, সেজো ভাই ৪ বিঘা আর ছোট ভাই ৩ বিঘা জমি পাওয়ার কথা (অনুপাত ১৬:৪:৪:৩)। কিন্তু পরে আমিন দিয়ে মেপে দেখা গেল নদীর ভাঙনের কারণে বাস্তবে জমি আছে মাত্র ২০ বিঘা। ৪ বিঘা জমি কম আছে। এখন কি ভাইয়েরা মারামারি করবেন যে বাবার দেওয়া ভাগের হিসেব ভুল ছিল? নাকি তারা ওই অবশিষ্ট ২০ বিঘা জমিকেই নিজেদের মধ্যকার ১৬:৪:৪:৩ অনুপাতে ভাগ করে নেবেন? অবশ্যই অনুপাত ঠিক রেখে জমি ভাগ করবেন, যাতে প্রত্যেকে তার অংশ অনুযায়ী সমানভাবে সামান্য কম পায় এবং কেউ পুরোপুরি বঞ্চিত না হয়।
নোট: মূল অনুপাত বা রেশিও (Ratio) একদম নিখুঁত রেখে পরিস্থিতি অনুযায়ী অংশ কমানোর এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে আধুনিক অর্থনীতি ও করপোরেট আইনের ভাষায় 'প্রপোশনাল রিডাকশন' (Proportional Reduction) বা 'আনুপাতিক হারে অংশ সমন্বয়' বলা হয়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন