আমাদের মনে প্রায়ই একটা প্রশ্ন উঁকি দেয়, যা নিয়ে অনেকের মাঝেই বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
প্রশ্নটা অনেকটা এইরকম:
"স্রষ্টা যদি আগে থেকেই জানেন আমি জান্নাতে যাব নাকি জাহান্নামে, তাহলে দুনিয়াতে পাঠিয়ে এই পরীক্ষার কী দরকার ছিল? আমাদের ভাগ্য ও তাকদির যদি আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে, তবে সরাসরি ভালো মানুষদের জান্নাতে আর খারাপ মানুষদের জাহান্নামে দিয়ে দিলেই তো হতো!"
প্রথম দেখায় প্রশ্নটাকে খুব বুদ্ধিদীপ্ত মনে হতে পারে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এবং যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করলে বুঝবেন, এই ধারণার গোড়াতেই একটা বড় ভুল বোঝাবুঝি লুকিয়ে আছে। চলুন, আধুনিক বিজ্ঞান ও ডাইমেনশনের ধারণাকে কাজে লাগিয়ে একদম সহজ ভাষায় এর আসল সমাধানটা জেনে নিই।
১. আগে থেকে জানা আর জোর করে করানো এক নয়
সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝিটা হয় এখানেই। আমরা অনেকেই মনে করি, স্রষ্টা যেহেতু আগে থেকে আমাদের ভাগ্য জানেন বা তাকদিরে লিখে রেখেছেন, তাই হয়তো আমরা সেটাই করতে বাধ্য হচ্ছি। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে মোটেও তেমন নয়।
স্রষ্টার অসীম ক্ষমতা হলো তিনি সময়ের সীমানা পেরিয়ে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একসাথে দেখতে পান। আপনি ভবিষ্যতে কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা তিনি আপনার ওপর জোর করে চাপিয়ে দেননি। আপনি আপনার নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় যা করবেন, তিনি তাঁর অসীম ক্ষমতার কারণে তা আগে থেকে জানেন।
২. স্রষ্টা সময়ের ঊর্ধ্বে
যখন বলা হয় "স্রষ্টা আগে থেকে সবকিছু জানেন", তখন স্রষ্টাকে আমাদের মতোই ত্রিমাত্রিক (3D) একজন সত্তা ভেবে নেওয়ার একটা প্রবণতা কাজ করে। যিনি এই মহাবিশ্ব এবং সময় তৈরি করেছেন, তিনি প্রকৃতির নিয়মেই এই সময়ের সীমানার ঊর্ধ্বে। আমাদের মানুষের কাছে যেটা "অতীত", "বর্তমান" বা "ভবিষ্যৎ", স্রষ্টার কাছে তা নয়। আমরা সময়ের ভেতর বন্দী বলে একটা নদীর শুধু একদিকের অংশ দেখতে পাই। কিন্তু যিনি ওপর থেকে পুরো নদীটা দেখছেন, তাঁর কাছে নদীর শুরু এবং শেষ একই সাথে দৃশ্যমান।
স্রষ্টার কাছে কোনো "ভবিষ্যৎ জ্ঞান" বা "অগ্রিম জ্ঞান" বলে কিছু নেই। তিনি মহাবিশ্বের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছুকে একটি "অনন্ত বর্তমান" হিসেবে দেখছেন।
আপনি আজকে যে কাজটি করছেন, স্রষ্টা তা আগামীকাল বসে "আগে থেকে" দেখছেন না, বরং তিনি সময়ের বাইরে থেকে আপনার বর্তমান মুহূর্তের স্বাধীন সিদ্ধান্তটিকেই সরাসরি দেখছেন। সুতরাং, স্রষ্টার জানা থাকাটা আপনার কর্মের ওপর কোনো পূর্ব-প্রভাব ফেলে না, কারণ তাঁর কাছে সবই বর্তমান। আগে থেকে জানা আর জোর করে করানো সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।
৩. রহস্যময় ডাইমেনশন বা মাত্রা এবং মানুষের সীমাবদ্ধতা
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের 'স্ট্রিং থিওরি' অনুযায়ী, আমাদের এই মহাবিশ্বে অন্তত ১০ থেকে ১১টি ডাইমেনশন বা মাত্রা রয়েছে। আমরা মানুষরা মাত্র ৩টি ডাইমেনশন (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা) দেখতে পাই এবং ৪র্থ ডাইমেনশন অর্থাৎ "সময়" এর স্রোতে সামনের দিকে ভেসে চলি। আমরা চাইলেও সময়ে পেছনে যেতে পারি না, বা ভবিষ্যতের পর্দা ভেদ করতে পারি না।
যে স্রষ্টা এই রহস্যময় উচ্চতর ডাইমেনশনগুলো তৈরি করেছেন, তাঁর ক্ষমতা আমাদের এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে ১০০% ধরা না পড়াটাই স্বাভাবিক। বিজ্ঞান নিজেই স্বীকার করে যে, উচ্চতর মাত্রার (Higher Dimension) কোনো সত্তার কর্মকাণ্ড নিচের মাত্রার (Lower Dimension) সত্তারা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারে না।
স্রষ্টা উচ্চতর মাত্রা থেকে মানুষের পুরো জীবনরেখা একসাথে দেখতে পান। তিনি জানেন আপনি আপনার স্বাধীন ইচ্ছায় কী বেছে নেবেন, কিন্তু তিনি আপনার ইচ্ছা কেড়ে নেননি।
৪. সরাসরি শাস্তি দিলে কি ন্যায়বিচার হতো?
ধরে নিন, একজন পুলিশ অফিসার অলৌকিক কোনো উপায়ে আগে থেকেই ১০০% নিশ্চিতভাবে জানেন যে, রাস্তার ওই লোকটা আজ থেকে ৫ বছর পর একটা অপরাধ করবে। এখন পুলিশ অফিসার যদি সেই অপরাধ ঘটার ৫ বছর আগেই লোকটাকে ধরে কারাদণ্ড দিয়ে দেন, তাহলে কি সেটা ন্যায়বিচার হবে? আদালত কি তা মেনে নেবে?
কখনোই না! কারণ আইন বলে, অপরাধ বাস্তবে ঘটার আগে কাউকে শাস্তি দেওয়া যায় না।
স্রষ্টা যদি দুনিয়া নামের এই পরীক্ষার ক্ষেত্র না বানিয়ে কোনো মানুষকে সরাসরি শাস্তি দিয়ে দিতেন, তবে সেই মানুষটা চিৎকার করে প্রতিবাদ করত। সে বলত, "আমি তো কোনো অপরাধই করিনি! আমাকে একটা সুযোগ না দিয়ে, কোনো প্রমাণ ছাড়াই আপনি কীভাবে আমাকে শাস্তি দিচ্ছেন?" স্রষ্টা পরম ন্যায়বিচারক, তিনি মানুষকে এই আক্ষেপ বা অভিযোগ করার কোনো সুযোগ দিতে চান না। তাই তিনি দুনিয়ার জীবন দিয়েছেন, যাতে মানুষ নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় নিজের কাজের প্রমাণটা নিজেই তৈরি করতে পারে।
৫. মহাজাগতিক হাই-টেক মেমোরি রেকর্ড ও সিসিটিভি ক্যামেরা
পরকালে যখন কেউ নিজের অন্যায় বা ভুল কাজ অস্বীকার করতে চাইবে, তখন স্রষ্টা তার সামনে অকাট্য প্রমাণ হাজির করবেন। এই দুনিয়াতে মানুষের প্রতিটি সেকেন্ডের কর্মকাণ্ড কোয়ান্টাম লেভেলে রেকর্ড করা হচ্ছে।
একে আমরা বর্তমান যুগের আল্ট্রা-এইচডি সিসিটিভি ক্যামেরার সাথে তুলনা করতে পারি। পরকালে যখন এই মহাজাগতিক ভিডিও ফুটেজ মানুষের চোখের সামনে প্লে করা হবে, তখন মানুষের নিজের হাত, পা এবং চোখ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। নিজের করা কাজের সেই হাই-টেক ভিডিও ফুটেজ দেখার পর আর প্রতিবাদ করার বা স্রষ্টাকে অন্যায়কারী বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকবে না।
৬. মানুষ কোনো রোবট নয়, মানুষের আছে 'স্বাধীন ইচ্ছা'
স্রষ্টা মানুষকে কোনো চাবি দেওয়া খেলনা পুতুল বা কোডিং করা রোবট বানিয়ে দুনিয়ায় পাঠাননি। তিনি মানুষকে দুটি বিশেষ জিনিস দিয়েছেন:
1. বিবেক ও বিচারবুদ্ধি: ভালো এবং মন্দের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা।
2. স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি: যেকোনো একটি পথ নিজের পছন্দে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা।
সবচেয়ে বড় কথা, স্রষ্টা মানুষকে ভালো এবং মন্দ - উভয় কাজ করারই সমান 'এক্সেস' (Access) বা সুযোগ দিয়ে রেখেছেন। স্রষ্টা আপনার হাতকে অন্যায় করার ক্ষমতাও দিয়েছেন, আবার সেই হাত দিয়ে কোনো অসহায় মানুষকে সাহায্য করার ক্ষমতাও দিয়েছেন। আপনি আপনার বিবেক ব্যবহার করে কোন কাজটি করবেন, সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আপনার। কেবল এবং কেবলমাত্র এই স্বাধীন সিদ্ধান্তের কারণেই মানুষ তার ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত হবে এবং মন্দ কাজের জন্য দায়ী হবে।
শেষ কথা
বিজ্ঞানের ভাষায় খুব সহজ করে বললে, স্রষ্টা সময়ের বাইরে থেকে সবকিছু দেখছেন, এটা স্রষ্টার অসীম ক্ষমতা। আর মানুষ সময়ের ভেতরে থেকে নিজের বিবেক দিয়ে কাজ করে, এটা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা। স্রষ্টার জানার কারণে মানুষের ভাগ্য বা স্বাধীন ইচ্ছা হারিয়ে যায় না।
দুনিয়া কোনো অর্থহীন বিষয় নয়, এটি হলো প্রমাণ সংগ্রহের একটি আইনি প্রক্রিয়া। এখানে মানুষ নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় যা করছে, সেটাই রেকর্ড করা হচ্ছে। আর সেই রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করেই পরকালে বিচার হবে। অতএব, স্রষ্টার জ্ঞানও নিখুঁত, আর মানুষের দায়বদ্ধতাও শতভাগ সত্য।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন